সাত সতেরো থুড়ি সাত দু’গুণে চোদ্দো, সেই সাত থেকে শুরু করে গোটা সপ্তাহটা জুড়েই চলল প্রেমের প্রাক্ উৎসব। রোজ ডে, প্রপোজ ডে, চকোলেট ডে, টেডি ডে, প্রমিস ডে, হাগ ডে ইত্যাদি প্রভৃতি পেরিয়ে অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত লভ দিবস। জেনারেশন এক্স, ওয়াই, জেড সক্কলের ঘুম কেড়ে আজ ভ্যালেন্টাইন্স ডে। শীতের সকাল, দুপুর, সন্ধে সর্বত্র অপ্রেমের খিল্লি উড়িয়ে আজকে প্রেমওয়াক করবেন যুগলেরা। লিখেছেন শর্মিষ্ঠা ঘোষ চক্রবর্তী

উইল ইউ বি মাই ভ্যালেন্টাইন— হাতে একগুচ্ছ গোলাপ নিয়ে নতজানু হয়ে প্রেমের আকুতি এমন বিভোর স্বপ্নে চোদ্দোই ফেব্রুয়ারি ঘুম ভাঙে অনেকেরই। ফেব্রুয়ারি মাস মানেই বসন্ত এসে গেছে। একটা বেশ প্রেম-প্রেম আবহ। সঙ্গী বা সঙ্গিনীকে একরাশ উপহার দেবার, হাতে হাত রাখবার, একটু ছোঁয়ার দুর্দান্ত অজুহাত ভ্যালেন্টাইন ডে। সমালোচকরা হয়তো বলবেন প্রেমের আবার দিন কী! এত ঝগড়া, হিংসা, হানাহানির মাঝে হোক না প্রেমের জন্য একটা দিন ক্ষতি কী! সারাদিন, রাত, মাসের দূরত্ব, ঝগড়া, ভুল বোঝাবুঝির কাটাকুটির জন্য থাক না একটা আস্ত দিন। তবে অনেকেরই ধারণা ভ্যালেন্টাইন্স ডে শুধুই প্রেমিক-প্রেমিকা বা দম্পতিদের জন্যই তা কিন্তু একেবারেই নয়। ভ্যালেন্টাইন হতে পারে সেই প্রিয়জনও যে আপনার জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদিও জেনারেশন নেক্সটদের কাছে এটা আদ্যোপান্ত নিখাদ প্রেমেরই দিন। কামদেবের স্তুতিময় অর্চনা।

ভ্যালেন্টাইন ডে নিয়ে নানা গল্পগাথা রয়েছে, সবকিছুর সত্যতা যাচাই একটু মুশকিল। প্রাচীন রোমে ১৪ ফেব্রুয়ারি ছিল ভালবাসার দিবস। রোমান দেবী জুনো প্রেমের দেবী বলেই পরিচিত। তাই ১৪ ফেব্রুয়ারি ছিল রোমান দেবী জুনোর সম্মানার্থে ছুটির একটি দিন। যেহেতু তিনি প্রেমের দেবী তাই এটা প্রেমের দিন।
ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায় সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের নামানুসারে এই দিনটার নামকরণ হয়েছিল। তৃতীয় শতকে দ্বিতীয় ক্লডিয়াস ছিলেন রোমের সম্রাট। যিনি এক সময় আইন প্রণয়ন করে রোমের সেনাবাহিনীতে কর্মরত যুবকদের বিবাহ নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন। কারণ তিনি মনে করতেন অবিবাহিত থাকলে সৈন্যদল অনেক বেশি দক্ষতার সঙ্গে দেশের প্রতি কর্তব্য পালন করতে পারবে। সেন্ট ভ্যালেন্টাইন ছিলেন রোমের ধর্মযাজক এবং চিকিৎসক পাশাপাশি একজন ধর্মপ্রচারকও। এই আইন ঘোষণার পর তিনি তাঁর প্রতিবাদস্বরূপ রোমান সেনাবাহিনীতে বিবাহে ইচ্ছুক সেনাদের গোপনে বিয়ে দিতে শুরু করেন। ভালবাসার প্রচার করতে থাকেন। তাঁর এই গোপন ক্রিয়াকলাপের কথা সম্রাট জানতে পেরে তাকে প্রথমে বন্দি করেন এবং পরে মৃত্যুদণ্ড দেন।

আরও একটা কাহিনি অনুসারে তৃতীয় দশকে সম্রাট ক্লডিয়াসের আমলে রোমে ক্রিশ্চান ধর্ম নিষিদ্ধ ছিল। ক্রিশ্চান ধর্মযাজক সেন্ট ভ্যালেন্টাইন স্বীয় ধর্ম প্রচার করছিলেন রাজার আড়ালে, সেই অপরাধে তাঁকে কারাগারে বন্দি করা হয়েছিল। সেখানে তিনি কারারক্ষীর দৃষ্টিহীন কন্যাকে চিকিৎসা করে সুস্থ করে তোলেন এবং সেই অন্ধ মেয়ের প্রেমে পড়েন। সেই মেয়েটি আর তাঁর পরিবার খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত হয়। এই সব খবর রাজার কানে গেলে ঈর্ষান্বিত রাজা ক্রোধে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। মৃত্যুর আগে তিনি মেয়েটিকে একটি চিঠি লিখেছিলেন যাতে শেষে লেখা ছিল ‘লাভ ফ্রম ইওর ভ্যালেন্টাইন’ সেই দিনটি ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি। সেই থেকে এই দিনটি এবং তাঁর নাম দুই-ই প্রেমের প্রতীক হয়ে যায়। এরপর যখন খ্রিস্ট ধর্ম রোমে প্রাধান্য পেতে শুরু করল তখন ভ্যালেন্টাইনকে saint হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ৪৯৬ খ্রিস্টাব্দে ক্রিশ্চান ধর্মগুরু পোপ গ্লসিয়াস এই দিনটিকে সেন্ট ভ্যালেন্টাইন ডে হিসেবে ঘোষণা করেন।

বিশ্ব প্রেমদিবস এই ভ্যালেন্টাইন ডে। সারা পৃথিবী জুড়ে যুগলরা অঙ্গীকারবদ্ধ এ দিনটি পালন করতে। একটা সময় প্রেমের প্রধান মাধ্যম ছিল চিঠি। পাতার পর পাতায় কলমের কালি খরচ করে একে অপরকে অজানা সুগন্ধীমাখা সুখস্বপ্ন পৌঁছে দিত তাঁরা। কাব্যকাহিনিতে, এমনকী জনপ্রিয় বলিউডি মুভিতেও আমরা পায়রার পায়ে চিঠি বেঁধে প্রেমিক বা প্রেমিকার কাছে পৌঁছে দেবার দৃশ্য দেখেছি, শুনেছি। আড়চোখে চাহনি, এ ছাদ থেকে ও ছাদে দৃষ্টি বিনিময় বা লুকিয়েচুরিয়ে পরস্পরের দেখা হওয়া আজকের ভ্যালেন্টাইন্স ডেতে সেই সব চেনা দৃশ্য অস্তমিত প্রায়। পুরাতনি প্রেমের আমেজে হয়েছে নব্যরসের সঞ্চার। এখন চিঠির বদলে সুন্দর সুন্দর গ্রিটিংস কার্ড এসে গেছে। যা বলতে চায় মন যেভাবে বলতে চায় প্রিয়সঙ্গীকে নামীদামি কার্ড কোম্পানিগুলো তাই লিখে নিয়ে হাজির। কর্পোরেট প্রেমিক মিটিং সেরে টুক করে কার্ড কিনে রেস্তোরাঁর স্পেশাল টেবিল বুক করে হাজির তাঁর সঙ্গীটির সম্মুখে। পুরো একশোয় একশো। হাতে সুন্দর একটা গিফট। হার্ট শেপ কুশন, টেডি বিয়ার, নানাধরনের দেশি-বিদেশি প্রিমিয়াম অ্যাসরটেড চকোলেট-ক্যাডবেরি, হার্শেস, ফেরেরো রজার, টবলেরন সুন্দর সুন্দর প্যাকে রেডি থাকে বড় বড় মলগুলোয়, অনলাইন সাইটে, শপে সর্বত্র। থাকে ফুলের সম্ভারও। সবটাই সাজিয়ে গুছিয়ে আকর্ষণীয় মোড়কে মার্কেটে নিয়ে আসে বিভিন্ন কোম্পানি।

মুখোমুখি না বসলে কি ভ্যালেন্টাইন ডে জমে! এইদিন প্রেমের সেরা ঠিকানা রেস্তোরাঁ, কফিশপ, পাব। সেখানে নানান অফার থাকে ভ্যালেন্টাইন্স কাপলদের জন্য। শুধু এই দিনটার সেলিব্রেশনে প্রতিটা রেস্তোরাঁ, কাফেটেরিয়া সেজে ওঠে স্পেশাল ডেকরেশনে। এর সঙ্গে থাকে লাঞ্চ এবং ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের আয়োজন। বাঙালির পার্বণ বাঙালিয়ানায় মোড়া হলেও ভ্যালেন্টাইন পার্বণ কিন্তু সাহেবিয়ানায় মোড়া একটি দিন। কিছুটা চলে আসা ট্রাডিশন এবং কিছুটা আধুনিক ভাবধারার মিশেলেই খাবারের ঠেকগুলোয় থাকে ডেলিশিয়াস মিল। ভ্যালেন্টাইন ডেতে হার্ট শেপের রমরমা হৃদয় থেকে হৃদয়ে পৌঁছে যায় প্রেমের বার্তা, চিজি হার্ট শেপ ব্রেডস্টিক, হার্ট শেপ চকোলেট চিপ ব্যানানা পাই, ভ্যালেন্টাইন ব্রেকফাস্ট এগ, চিজ প্ল্যাটার, হার্ট শেপ প্যানকেক চকোলেট কেক, সুইটহার্ট সিনামন রোল,লাভ বার্গার, পাই, ভ্যালেন্টাইন ডে স্পেশ্যাল স্যালাড, চকোলেট প্যানাকোটা উইথ জেলো হার্ট, মকটেল— কী নেই। সঙ্গে থাকে লাইভ মিউজিক, ডান্স শো, এই দিন উপলক্ষে কাপলদের জন্য থাকে প্রচুর স্পেশ্যাল ডিসকাউন্ট।

আরও পড়ুন- কান পেতে রই…

এখানেই শেষ নয়, শহর জুড়ে একান্তযাপনের ডেস্টিনেশনগুলোও থাকে ভ্যালেন্টাইন কাপলদের অপেক্ষায়। প্রেমেরও ফাঁদ পাতা এই ভুবনে তাই প্রেমকে সেলিব্রেট করার জায়গার কোনও অভাব নেই। নলবন, সেন্ট্রাল পার্ক, ইকো পার্ক, প্রিন্সেপ ঘাট, ইলিয়ট পার্ক, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, পার্ক স্ট্রিট, ময়দান চত্বর— মনের মতো একটা বেছে নিলেই হল। একটু নিভৃতাবাস, প্রিয়জনের সঙ্গে দু’দণ্ডের স্বস্তি। আসলে প্রেমের কোনও যুগান্ত নেই, যুগে যুগে তার নব কলেবর। প্রজন্মর পর প্রজন্ম পেরিয়ে ভালবাসা একই রকম রয়ে গেছে। বদলে গেছে শুধু রুচি, পছন্দ, ভাবনা আর তার প্রকাশভঙ্গিমা। আর ভালবাসাকে উপজীব্য করে পৃথিবী জুড়ে তৈরি হয়েছে নিত্যনতুন অনুষঙ্গ।