নীহারেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়: অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রেই ক্ষমতা কিছুটা বিকৃতির জন্ম দেয়। ক্ষমতা যেখানে অল্প বিকৃতির মাত্রাও সেখানে কম, সচরাচর সেটা চোখের আড়ালেই থেকে যায়। কিন্তু ক্ষমতা যেখানে চূড়ান্ত, বিকৃতিও সেখানে চূড়ান্ত আকার ধারণ করে। দেশের একনায়ক বা রাজাদের ক্ষেত্রে এমন উদাহরণ ইতিহাসের পাতায় অজস্র ছড়িয়ে রয়েছে। এই তালিকার শীর্ষস্থানীয়দের মধ্যে অন্যতম রোমের সম্রাট ক্যালিগুলা। যিনি সম্রাট হওয়ার একবছর পর তাঁর সভাসদদের সাবধান করে দেওয়ার জন্য ঘোষণা করেছিলেন, ‘’মনে রাখবেন, যে কারুর প্রতি যা খুশি করার ক্ষমতা আমার রয়েছে।‘’ ক্যালিগুলা’র চার বছরের শাসনকালে তিনি শুধু প্রমাণ করে গিয়েছেন, তাঁর সাবধানবাণী বা বলা ভালো হুমকি নিছক কথার কথা ছিল না।

রোমের বিখ্যাত সেনাপতি জারমানিকাস (Germanicus) ও তাঁর স্ত্রী অ্যাগরোপিনা (Agrippina the Elder)–র প্রথম পুত্রের নাম ছিল গেয়াস জুলিয়াস সিজার জারমানিকাস (Gaius Julius Caesar Germanicus)। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে সৈনিকদের সাজে হাজির হওয়ায় সৈনিকরা তাকে আদর করে নাম দিয়েছিল ‘ক্যালিগুলা’ (Caligula), যার অর্থ সৈন্যদের ‘ছোট্ট বুট’ পরা শিশু। পরবর্তীকালে নামটি সম্রাটের অত্যন্ত অপছন্দের হওয়ায় এই নামে তাঁকে কেউ সম্বোধন না করলেও ইতিহাসের পাতায় সৈনিকদের দেওয়া নামটিই স্থায়িত্ব পেয়েছে।

১৭ খৃষ্টাব্দে জারমানিকাসের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবার তৎকালীন সম্রাট টাইবেরিয়াস (Tiberius) ও সম্রাটের রক্ষীদলের অধিনায়ক প্রবল ক্ষমতাশালী সিজেনাস (Sejanus)–এর বিষনজরে পড়ে। জনপ্রিয় সেনাপতিদের পুত্ররা তাদের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে এই আশঙ্কায় ক্যালিগুলার মা ও তাঁর সন্তানদের দেশদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত করে কারারুদ্ধ করা হয়। ক্যালিগুলার পিতামহী আন্তোনিয়া (Antonia) কোনওক্রমে ক্যালিগুলাকে বাঁচিয়ে অন্যত্র সরিয়ে দেন। ৩১ খৃষ্টাব্দে সিজেনাসের মৃত্যু হলে ক্যালিগুলা রোমে প্রত্যাবর্তন করেন।

ক্যালিগুলার মা অ্যাগরোপিনা ছিলেন সম্রাট টাইবেরিয়াসের ভাইঝি। নিজের ভাইঝি ও তাঁর অন্যান্য সন্তানদের বন্দি করলেও কোনও অজ্ঞাত কারণে সম্রাট তাঁর এই নাতিটির প্রতি দুর্বলতা দেখান। যদিও শোনা যায় তিনি তাঁর ঘনিষ্টজনদের কাছে প্রায়শই ক্যালিগুলা সম্পর্কে বলতেন যে তিনি রোম সাম্রাজ্যের মধ্যে একটি ‘বিষাক্ত সাপ’কে লালনপালন করছেন। তাঁর নিজস্ব ধারণা যাই হোক, বৃদ্ধ টাইবেরিয়াস কিন্তু ক্যালিগুলা ও তাঁর তুতো ভাই জেমেলাস (Gemellus )–কে যৌথ ভাবে তাঁর উত্তরাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেন। ৩৭ খৃষ্টাব্দে টাইবেরিয়াসের মৃত্যু হলে ক্যালিগুলার সুহৃদ ও সম্রাটের রক্ষীদলের প্রভাবশালী সদস্য মার্কো (Marco)–র কৌশলে ক্যালিগুলা একক ভাবে রোমের সম্রাট হওয়ার সুযোগ পান। একবছর পরেই ক্যালিগুলা মার্কো ও জেমেলাসকে একইসঙ্গে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন।

সম্রাট হওয়ার পর প্রথম ছ’মাস রোমের মানুষের কাছে ক্যালিগুলা চূড়ান্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তাঁর সংস্কারমূলক কাজকর্ম, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শাসনব্যবস্থা পরিচালনা সবকিছুই সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে তোলে। এরপরই ক্যালিগুলা এক কঠিন অসুখের কবলে পড়েন। কিছু ইতিহাসবিদের মতে এই সময় ক্যালিগুলাকে বিষপ্রয়োগ করা হয়েছিল। প্রকৃত ঘটনা যাই হোক এই অসুখ থেকে সেরে উঠে ক্যালিগুলা পরিণত হন সম্পূর্ণ অন্য মানুষে। স্পষ্টতই তাঁর মধ্যে মস্তিষ্ক বিকৃতির লক্ষণ দেখা দেয়। চূড়ান্ত অমিতব্যয়ী ও যৌন স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে ২৫ বছরের যুবক সম্রাট। তাঁর পার্শ্বচরদের স্ত্রীরাও তাঁর চরম যৌন লালসার হাত থেকে রক্ষা পায়নি। এবং তাঁর এই উপোভোগের কাহিনী যাতে কোনওরকম ভাবেই গোপন না থাকে সেদিকেও ছিল তাঁর সযত্ন প্রচেষ্টা।

সমুদ্রের ওপর একটি ভাসমান সেতু নির্মাণ করার জন্য ক্যালিগুলা রোমের কয়েকশ বাণিজ্যপোত অধিগ্রহণ করেন। সেই নির্মাণের মহৎ উদ্দেশ্য ছিল, ক্যালিগুলা যেন সেই সেতুর ওপর দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে দু’দিনের জন্য ঘুরে আসতে পারেন। বিনা কারণেই প্রাসাদ, উপাসনা গৃহ, রঙ্গশালা, লাইব্রেরি তৈরি করতে থাকেন। নারীসঙ্গ ও সুরাপান ছাড়া তাঁর প্রিয় আমোদের একটি ছিল অজস্র স্বর্ণমুদ্রার ওপর শয়ন করা। বিচিত্র পোশাক, এমনকি মেয়েদের পোশাক পরাও ছিল ক্যালিগুলার আরএকটি প্রধান শখ। গায়ে প্রচুর লোম থাকায় তিনি নিজের রূপ নিয়ে অত্যন্ত অসন্তুষ্ট ছিলেন। তাঁর উপস্থিতিতে কেউ যদি ‘ছাগল’ শব্দটি উচ্চারণ করত তাহলে সেই ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড ছিল অবশ্যম্ভাবী। রাতে চাঁদ উঠলে প্রায়ই দেখা যেত ক্যালিগুলা চাঁদের সঙ্গে কথাবার্তা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

ইতিহাসের মধ্যে কতটা সত্যের সঙ্গে কতটা অতিকথন মিলেমিশে যায় সেটা বলা খুবই শক্ত। ঐতিহাসিকের নিরপেক্ষতাও প্রশ্নাতীত নয়। কিন্তু ঐতিহাসিকদের বয়ানের ওপরই আমাদের নির্ভর করতে হয়। সেই ঐতিহাসিকেরাই জানাচ্ছেন, ক্যালিগুলা বন্দিদের নরখাদক জন্তুদের সামনে ছেড়ে দিতেন। মানুষের বীভৎস মৃত্যু দেখাটা তাঁর কাছে ছিল এক প্রিয় আমোদ। ক্যালিগুলার উন্মাদনা কতটা প্রকৃত এবং কতটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সেটিও পরবর্তীকালে ইতিহাসবিদদের ধন্দে ফেলেছে।

সম্রাটের প্রিয়তম ঘোড়াটির নাম ছিল ‘ইনসিটাটুস’ (Incitatus)। সেই ঘোড়ার আস্তাবলটি ছিল মার্বেল পাথরে বাঁধানো, খাওয়ার পাত্র অর্থাৎ ‘ডাবা’টি ছিল হাতির দাঁতের। ঘোড়াটির জন্য একটি বাড়িও করে দিয়েছিলেন রোম সম্রাট। এই ঘোড়াটিকেই ক্যালিগুলা তার সেনেট সদস্য করার কথা ঘোষণা করেন। রোমের সর্বোচ্চ নাগরিকেরাই একমাত্র এই সদস্যপদ পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হতেন। ক্যালিগুলার এই ঘোষণা নিছক পাগলামি নাকি সেনেট সদস্যদের অপমান করার কৌশল এ প্রশ্ন এখনও অমীমাংসিত হয়ে রয়েছে। যদিও সম্রাটের এই ইচ্ছে আর কাজে পরিণত হওয়ার সুযোগ পায়নি।

ইনসিটাটুস সেনেট সদস্য হবে এই বিচিত্র ঘোষণার কিছুদিনের মধ্যেই ৪১ খৃষ্টাব্দে নিজের রক্ষীদের হাতেই সপরিবারে খুন হন গেয়াস জুলিয়াস সিজার জারমানিকাস বা ক্যালিগুলা। তাঁর সীমাহীন স্বেচ্ছাচারিতা ও অমিতব্যয়ের কারণে রাজকোষ প্রায় শূন্য হয়ে পড়ে। ‘নৃশংস ও উন্মাদ’ সম্রাটের হাত থেকে রোমান প্রজাতন্ত্র রক্ষার স্বার্থে সেনেট ও সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁকে হত্যা করেছিলেন বলেই ইতিহাসবিদদের একাংশের অভিমত। এর বিপরীত মতবাদীরা বলেন, ক্যালিগুলা রোমের অভিজাতদের অন্তঃসারশূন্যতা প্রকাশ করে দিয়েছিল বলেই তাঁকে পাগল ও নৃশংস সাজিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। প্রকৃত সত্য কোনওদিন উদ্ঘাটিত হবে কিনা সে বিষয়ে প্রশ্নচিহ্ন থাকলেও রোম সম্রাটদের মধ্যে প্রথম খুন হওয়া ক্যালিগুলা যে আরও বহুদিন ইতিহাসের ‘কুখ্যাত’ সম্রাট হিসেবে বেঁচে থাকবেন সে বিষয়ে কোনও সংশয় নেই।